ফুটবল
‘মেসি স্বর্গের সঙ্গে করমর্দন করলেন’: ২৫ সেকেন্ডে যেভাবে ইতিহাস লিখলেন এক ধারাভাষ্যকার
বিডি সাইট নিউজ ডেস্ক·১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬·3 মিনিটের পড়া

কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম, যেখানে ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল
ছবি: AFL Architects on Vimeo.com, CC BY 3.0 — Wikimedia Commons২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, লুসাইলে মেসি ট্রফি তোলার মুহূর্তে ইংরেজ ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি যা বলেছিলেন, সেটি আজও কোটিবার শোনা হয়। মেসির আন্তর্জাতিক অবসরের পর কথাগুলো নতুন করে ফিরে এসেছে।
খেলা শেষ। পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। লুসাইল স্টেডিয়ামে মেসি ট্রফিটি তুলে ধরছেন। বিবিসির ধারাভাষ্য বুথে বসা পিটার ড্রুরি তখন চুপ করে ছিলেন কয়েক সেকেন্ড।
তারপর তিনি বলতে শুরু করলেন। প্রায় ২৫ সেকেন্ডের সেই কথাগুলো আজ ফুটবল-ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত ধারাভাষ্যের একটি।
যা বলেছিলেন ড্রুরি
“লিওনেল মেসি তাঁর শেষ শৃঙ্গটিও জয় করলেন। লিওনেল মেসি স্বর্গের সঙ্গে করমর্দন করলেন। সান্তা ফে-র রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি এইমাত্র স্বর্গে এসে দাঁড়াল।”
“তিনি ছিলেন সুন্দর। তিনিই ছিলেন সেই পার্থক্য। তিনি বরাবরই ছিলেন সেই পার্থক্য। অতুলনীয়।”
“কিন্তু পৃথিবীতে তাঁর হৃদয় যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি চেয়েছিল, সেটির প্রেমে যখন তিনি পড়ছেন — তখন এই ধারণা এড়ানো কঠিন যে আজ তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন সর্বকালের সেরা হিসেবে।”
(অনুবাদ: বিডি সাইট নিউজ। মূল ইংরেজি ধারাভাষ্য পিটার ড্রুরির।)
কেন কথাগুলো টিকে গেল
ধারাভাষ্যের প্রথম কাজ বর্ণনা — কে বল পেলেন, কে গোল করলেন। ড্রুরি সেই কাজটি করেননি। মাঠে তখন কী ঘটছে, দর্শক তা দেখতেই পাচ্ছিলেন। তিনি বললেন ঘটনাটির মানে কী।
লক্ষ করুন একটি বাক্যাংশ তিনি তিনবার ব্যবহার করেছেন — ‘সেই পার্থক্য’। এটি ভুল নয়, অলংকার। ধর্মীয় প্রার্থনার মতো পুনরাবৃত্তি, যা একটি সাধারণ বাক্যকে ঘোষণায় বদলে দেয়।
আর ‘স্বর্গের সঙ্গে করমর্দন’ — এই উপমাটি অদ্ভুত, প্রায় অস্বস্তিকর। স্বর্গের সঙ্গে কেউ করমর্দন করে না। কিন্তু ওই অস্বস্তিটুকুই ওই মুহূর্তের সঙ্গে মেলে, কারণ ওই রাতটিও স্বাভাবিক ছিল না।
সবচেয়ে বড় কৌশলটি অবশ্য একটি শব্দে — ‘ছোট্ট ছেলেটি’। বিশ্বের সেরা ফুটবলার, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স, হাতে বিশ্বকাপ। আর ধারাভাষ্যকার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন রোজারিওর সেই রোগা বাচ্চাটির কাছে, যাকে একসময় বৃদ্ধির হরমোন নিতে হতো।
একটি বাক্যে পুরো জীবনটা।
ইংরেজি ধারাভাষ্যের একটি ঐতিহ্য
ড্রুরি একা নন। ব্রিটিশ ধারাভাষ্যে সাহিত্যের একটি দীর্ঘ ধারা আছে — কেনেথ ওলস্টেনহোম, ব্যারি ডেভিস, জন মোটসন। এই ঘরানায় ধারাভাষ্যকার কেবল সাংবাদিক নন, তিনি মুহূর্তের কবি।
ড্রুরি সেই ঐতিহ্যের বর্তমান উত্তরাধিকারী। তিনি কাজ করেছেন হোস্ট ব্রডকাস্ট সার্ভিসেসের ইংরেজি ওয়ার্ল্ড ফিডেও — যে কারণে তাঁর কণ্ঠ সেদিন পৌঁছেছিল কয়েক ডজন দেশে।
বাংলাদেশে যেভাবে পৌঁছাল
বাংলাদেশে সেই রাতে বেশিরভাগ মানুষ খেলা দেখেছেন বাংলা বা হিন্দি ধারাভাষ্যে। ড্রুরির কথাগুলো এ দেশে পৌঁছেছে পরে — ফেসবুক রিল, ইউটিউব ক্লিপ আর টিকটকের মাধ্যমে, বারবার, হাজারবার।
যাঁরা ইংরেজি ভালো বোঝেন না, তাঁরাও ওই কণ্ঠস্বরটি চিনে ফেলেছেন। কারণ আবেগের অনুবাদ লাগে না।
আর এখন, যখন মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়ে দিয়েছেন
কথাগুলো আবার ফিরে এসেছে। ফিরে আসবেও।
কারণ ভিডিও ঝাপসা হয়ে যায়, রেকর্ড ভেঙে যায়, পরিসংখ্যান পুরোনো হয়। কিন্তু ভাষা টিকে থাকে। ১৯৬৬ সালের ওলস্টেনহোমের একটি বাক্য আজও ইংল্যান্ডের মানুষ মুখস্থ বলতে পারেন।
লুসাইলের ওই ২৫ সেকেন্ডও তেমনই থেকে যাবে। মেসির ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে। তাঁর ধারাভাষ্যটি হয়নি।
প্রেক্ষাপট — এর পেছনে যা ঘটেছিল
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-৩ ফ্রান্স, টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জয়ী। ১৮ ডিসেম্বর, লুসাইল স্টেডিয়াম।
পিটার ড্রুরি ওই ফাইনালে ধারাভাষ্য দিয়েছেন বিবিসির হয়ে; তিনি হোস্ট ব্রডকাস্ট সার্ভিসেসের ইংরেজি ওয়ার্ল্ড ফিডেও কাজ করেছেন।
মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট।
সূত্র: বিবিসি, প্ল্যানেট ফুটবল, স্পোর্টসকিডা

