ফুটবল
২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, এক বিশ্বকাপ: আকাশি-সাদা জার্সি তুলে রাখলেন মেসি
বিডি সাইট নিউজ ডেস্ক·১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬·3 মিনিটের পড়া

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি
ছবি: Bryan Berlin, CC BY-SA 4.0 — Wikimedia Commonsএকুশ বছর ধরে একটি দেশ শ্বাস আটকে রেখেছিল একজোড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে। আজ সেই পা থেমেছে। আকাশি-সাদা ডোরাটি আজ অনাথ।
এবং তিনি হাঁটছেন।
মাঠের দিকে নয় — মাঠ থেকে দূরে। কোনো বিদায়ী ম্যাচ নেই, কোনো ফুলের তোড়া নেই, গ্যালারিভরা কান্না নেই। শুধু একটি পোস্ট, একটি সোমবার, আর একটি বাক্য। যে মানুষটি দুই দশক ধরে একটি জাতির হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তিনি বিদায় নিচ্ছেন প্রায় ফিসফিস করে।
শুনুন। সংখ্যাগুলো শুনুন।
দুইশ সাত ম্যাচ। একশ পঁচিশ গোল। ছয়টি বিশ্বকাপ। একুশটি বছর। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে কেউ এত খেলেননি, কেউ এত করেননি, কেউ এত দেননি।
কিন্তু সংখ্যা দিয়ে সূর্য মাপা যায় না।
কারণ আপনি যখন বলটি ছুঁতেন, সময় একটু থমকে যেত। মাঠে আটাশজন ছুটছেন, আর একজন হাঁটছেন — এবং হাঁটতে হাঁটতেই তিনি দেখে ফেলছেন এমন একটি পাস, যেটি এখনো পৃথিবীতে জন্মায়নি।
মনে পড়ে ২০০৬?
একটি রোগা ছেলে, আঠারো বছর বয়স, হাঙ্গেরির বিপক্ষে নামলেন। সাতচল্লিশ সেকেন্ড। তারপর লাল কার্ড। মাঠ ছাড়লেন কাঁদতে কাঁদতে। ওহ, সেই কান্না! কেউ জানত না, ওই অশ্রু দিয়েই লেখা শুরু হচ্ছে একটি মহাকাব্যের প্রথম পঙ্ক্তি।
তারপর এলো দীর্ঘ শাস্তি।
২০১৪, মারাকানা। ট্রফিটি দাঁড়িয়ে আছে, আর তিনি হেঁটে যাচ্ছেন তার পাশ দিয়ে — তাকিয়ে, কিন্তু ছুঁতে না পেরে। একটি প্রজন্ম ওই একটি ছবিতে কেঁদেছে। ২০১৫ — হার। ২০১৬ — আবার হার। পেনাল্টি মিস, এবং একটি অবসর ঘোষণা যা টেকেনি।
একটি দেশ তখন তাঁকে ভালোবাসত। কিন্তু বিশ্বাস করত না।
আর তারপর — মারাকানা, আবার। ২০২১।
এবার ব্রাজিলের মাঠে, ব্রাজিলের বিপক্ষে, ব্রাজিলের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে। আটাশ বছরের খরা শেষ! মাঠে শুয়ে পড়লেন তিনি, আর মনে হলো কেউ যেন একটি গোটা পাহাড় নামিয়ে রাখল তাঁর কাঁধ থেকে।
এবং তারপর, লুসাইল।
রাত। কাতার। আঠারোই ডিসেম্বর, দুই হাজার বাইশ। ফ্রান্স, এমবাপ্পে, হ্যাটট্রিক, টাইব্রেকার — এবং তারপর সেই মুহূর্ত, যেটি ফুটবল আর কখনো ভুলবে না।
ছত্রিশ বছর পর সোনালি ট্রফিটি ফিরল আর্জেন্টিনায়। ম্যারাডোনার পর, মেসির হাতে। সেই রাতে বুয়েনস আইরেস ঘুমায়নি। রোজারিও ঘুমায়নি।
এবং ঢাকাও ঘুমায়নি।
কারণ এই গল্পটি শুধু আর্জেন্টিনার নয়। ঢাকার অলিগলিতে, চট্টগ্রামের ছাদে, সিলেটের চায়ের দোকানে যে আকাশি-সাদা পতাকাগুলো ওড়ে — তারা কখনো বুয়েনস আইরেস দেখেনি, স্প্যানিশ বোঝে না, দশ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকে। তবু তারা ২০১৪-তে কেঁদেছে আর ২০২২-এ রাস্তায় নেমেছে।
একজন মানুষ কীভাবে সাত সমুদ্র পেরিয়ে একটি দেশের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠেন?
উত্তরটি জানা নেই। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে।
তারপর ২০২৬ এলো। শেষ নাচ। ঊনচল্লিশ বছর বয়সে আরেকটি ফাইনাল — এবং স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে একটি গোল, একটিমাত্র গোল, যেটি সব শেষ করে দিলো।
শেষটা তাই ট্রফিতে নয়। শেষটা একটি ক্ষতে।
কিন্তু ফুটবল তো রূপকথা নয়। ফুটবল জীবন। আর জীবন সবসময় শেষ পাতাটি সুন্দর করে লেখে না।
তিনি অবশ্য থামছেন না পুরোপুরি — ইন্টার মায়ামিতে বল এখনো তাঁর পায়েই থাকবে। কিন্তু ওই ডোরাকাটা জার্সিটি, যার দশ নম্বরে একদিন ম্যারাডোনা ছিলেন — সেটি আর কখনো তাঁর পিঠে উঠবে না।
জার্সিটি এখন হ্যাঙ্গারে ঝুলছে। এবং সেটি খুব, খুব ভারী।
ধন্যবাদ, লিও।
আপনি যেভাবে বলটিকে ছুঁয়েছেন, সেভাবে আর কেউ ছোঁয়নি।
আর কখনো ছোঁবে কি না — আমরা জানি না।
প্রেক্ষাপট — এর পেছনে যা ঘটেছিল
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল — দুটিই আর্জেন্টিনার রেকর্ড।
শিরোপা: বিশ্বকাপ ২০২২; কোপা আমেরিকা ২০২১ ও ২০২৪; সব মিলিয়ে ছয়টি আন্তর্জাতিক শিরোপা।
রানার্সআপ: বিশ্বকাপ ২০১৪ ও ২০২৬; কোপা আমেরিকা ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬।
ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ, বিশ্বকাপে গোল ২১টি।
ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে।
সূত্র: সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, এনপিআর

