খেলাধুলা
বিশ বছরের একটি প্রেমপত্র: হাজারো মুহূর্তে যেভাবে ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন মেসি
বিডি সাইট নিউজ ডেস্ক · ২০ জুলাই, ২০২৬

২০০৬ সালের এক বিকেলে জার্মানিতে বদলি হয়ে নেমেছিলেন আঠারো বছরের এক কিশোর। ২০২৬ সালের আরেকটি রাতে, উনচল্লিশ বছর বয়সে, ট্রফি ছাড়াই মাঠ ছাড়লেন সেই মানুষটি — সম্ভবত শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে। ফলাফল যা-ই হোক, মাঝের বিশ বছর জুড়ে বিশ্ব দেখেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে সুন্দর একটি প্রেমকাহিনি — একজন মানুষ আর একটি বলের।
রোববার রাতের ফাইনালে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরেছে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল মেসির। কিন্তু ট্রফি হাতে না ওঠাটাই যদি এই মানুষটির গল্পের শেষ কথা হতো, তাহলে ফুটবল অনেক আগেই তাঁকে ভুলে যেত। মেসির আসল উত্তরাধিকার ট্রফির ক্যাবিনেটে নয় — কোটি মানুষের স্মৃতিতে, হাজারো মুহূর্তে, যা তিনি একা তৈরি করেছেন বলটাকে সঙ্গী করে।
ফিফা ও ইয়াহু স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে বদলি নেমে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় মেসির — আর্জেন্টিনার ইতিহাসে বিশ্বকাপে খেলা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার তিনি, সেদিনই করেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল। সেই ম্যাচের ফুটেজ আজ দেখলে মনে হয়, ছেলেটি যেন জানতই না ক্যামেরা তার দিকে তাক করা — শুধু বলের সঙ্গে খেলছিল, নিজের মতো করে।
কুড়ি বছরে খেলা বদলায়, সতীর্থ বদলায়, প্রতিপক্ষ বদলায় — কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি। বল যখন তাঁর পায়ে আসে, মনে হয় বলটাও যেন স্বস্তি পায়। জোর করে থামানো নয়, জোর করে ঠেলে দেওয়া নয় — এক অদ্ভুত ভদ্রতায় বলটা তাঁর সঙ্গে চলে, যেন দুজনের মধ্যে বহু বছরের বোঝাপড়া। ফুটবল বিশ্লেষকেরা যাকে বলেন 'বল কন্ট্রোল', ভক্তরা তাকে বলেন জাদু। আসলে এটা তার চেয়েও গভীর কিছু — এটা কথোপকথন। প্রতিটা টাচেই যেন তিনি বলের সঙ্গে ফিসফিস করে কিছু বলেন, আর বলটা তাঁর কথা শোনে।
মাঠে তাঁর দৌড়টাও তুলনাহীন। জোরে ছোটেন না, তবু প্রতিপক্ষের রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শরীরের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি মোচড় যেন শিল্পীর তুলির টান — কেউ ক্যানভাসে ছবি আঁকেন রং দিয়ে, মেসি আঁকেন বল আর মাঠ দিয়ে। একই ড্রিবল বারবার দেখেও চোখ ফেরানো যায় না, ঠিক যেমন মোনালিসার হাসির রহস্য বারবার দেখেও ফুরোয় না। ফুটবলে সৌন্দর্যের এমন সংজ্ঞা আর কেউ লিখতে পারেননি।
কিন্তু এই বিশ বছরের গল্পটা শুধু প্রতিভার নয় — এটা এক অদম্য মানুষের গল্প। কিশোর বয়সে গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভোগা একটি ছেলে, যার পরিবারকে বার্সেলোনা পাড়ি দিতে হয়েছিল চিকিৎসার খরচ জোগাতে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের ফাইনাল হারের পর যে মানুষটি জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ভেবেছিলেন। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টি মিস করে চোখের জলে মাঠ ছাড়া মানুষটিই ২০২১ সালে অবশেষে প্রথম বড় শিরোপা জেতেন আর্জেন্টিনার হয়ে। ব্যর্থতা তাঁকে ভাঙেনি, বরং প্রতিবারই আরও দৃঢ় করে গড়েছে। এই কারণেই তিনি শুধু ফুটবলার নন — এক প্রজন্মের কাছে অধ্যবসায়ের পাঠ।
২০২২ কাতারে অবশেষে হাতে তুলেছিলেন সোনার ট্রফিটা — ফুটবলবিশ্ব সেদিন কেঁদেছিল আনন্দে, যেন নিজের পরিবারের কেউ স্বপ্নপূরণ করল। চার বছর পরও তিনি থামেননি। এই বিশ্বকাপেও করেছেন ৮ গোল, সেমিফাইনালে জোড়া অ্যাসিস্টে একাই দলকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনালে। প্রমাণের কিছু বাকি ছিল না তাঁর, তবু প্রতিটি ম্যাচ খেলেছেন যেন এটাই শেষ সুযোগ — আর শেষ পর্যন্ত হয়তো সত্যিই তা-ই হলো।
ফাইনালে স্পেনের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভাঙা হলো না। ট্রফিটা এবার উঠল না তাঁর হাতে। কিন্তু বিশ বছর ধরে যে ভালোবাসা তিনি বুনেছেন, একটি হারে তা মুছে যাওয়ার নয়। এরপর যত বড় খেলোয়াড়ই আসুক, বলের সঙ্গে এমন নিঃশব্দ প্রেম, এমন ভদ্র দখল আর কখনো দেখা যাবে কি না, কে জানে। রোববার রাতে হয়তো লেখা হয়ে গেল বিশ্বমঞ্চে তাঁর শেষ অধ্যায় — কিন্তু হাজারো মুহূর্ত, হাজারো ড্রিবল, হাজারো গোল যা তিনি রেখে গেছেন, সেগুলো থেকে যাবে চিরকাল। ট্রফি জং ধরে, স্মৃতি ধরে না।
ধন্যবাদ, লিও। আপনি শুধু গোল করেননি, ফুটবলটাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন কোটি মানুষকে — বাংলাদেশের অলিগলি থেকে বুয়েনস আইরেসের রাস্তা পর্যন্ত। হারলেও, আমাদের কাছে আপনিই থাকবেন চিরকালের চ্যাম্পিয়ন।