খেলা
২৬ বছরে মাত্র ৬ টেস্ট: অস্ট্রেলিয়ার অবহেলার জবাব বাংলাদেশ দিচ্ছে ডারউইনে
বিডি সাইট নিউজ ডেস্ক·১৪ আগস্ট, ২০২৬·3 মিনিটের পড়া

ডারউইনে দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ এগিয়ে ১৫৩ রানে। কিন্তু এই টেস্টের সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি স্কোরবোর্ডে নেই — সেটি ২৩। এত বছর পর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে গেল।
মারারা ওভালের স্কোরবোর্ড দ্বিতীয় দিন শেষে যা বলছে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের অভিজাত মহলের জন্য তা স্বস্তির নয়। স্বাগতিকরা প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেছে ১৯৮ রানে। বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ৩৫১ রান তুলে এগিয়ে ১৫৩ রানে।
তানজিদ হাসান তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি — ১৯৭ বলে ১০১। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত করেছেন ১২৬ বলে ৮৪, মুমিনুল হক ৪৯, মুশফিকুর রহিম ৩৬, আর মেহেদী হাসান মিরাজ অপরাজিত ৩২ রানে। মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউড দুটি করে উইকেট পেলেও প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে দিনভর নির্বিষ দেখিয়েছে।
কিন্তু এই ম্যাচের আসল গল্পটি রানের নয়, সময়ের। বাংলাদেশ সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলেছিল ২০০৩ সালে। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। একটি প্রজন্ম পুরো ক্রিকেট জীবন শেষ করে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্টও না খেলে।
সংখ্যাটি আরও কঠিন হয় যখন পুরো হিসাব সামনে আসে। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ২৬ বছরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলতে পেরেছে মাত্র ছয়টি টেস্ট — ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় দুটি, ২০০৬ সালে দেশের মাটিতে দুটি এবং ২০১৭ সালে দেশের মাটিতে দুটি। একই সময়ে অ্যাশেজ হয়েছে প্রায় প্রতি দুই বছর পরপর।
ভেন্যুর তালিকাটিও কম কথা বলে না। এই সিরিজ হচ্ছে না মেলবোর্ন, সিডনি, ব্রিসবেন কিংবা পার্থে। প্রথম টেস্ট ডারউইনে, যেখানে সর্বশেষ টেস্ট হয়েছিল ২০০৪ সালে। দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাকাইয়ে, যেটি অস্ট্রেলিয়ার ১২তম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক করছে এই সিরিজেই।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাখ্যা অযৌক্তিক নয়। তাদের শীতে দক্ষিণের বড় মাঠগুলো অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলের দখলে থাকে, আর উত্তরের শুষ্ক মৌসুমই তখন ক্রিকেটের একমাত্র জানালা। ভৌগোলিকভাবে যুক্তিটি টেকে।
প্রশ্নটা তাই ভেন্যু নিয়ে নয়, মৌসুম নিয়ে। বাংলাদেশকে কেন অস্ট্রেলিয়ার মূল গ্রীষ্মের সূচিতে জায়গা দেওয়া হলো না, যেখানে দর্শক আসে, সম্প্রচার-স্বত্ব বিক্রি হয় এবং একটি সিরিজ সত্যিকার অর্থে বড় হয়ে ওঠে?
সূচি বদলের কারণটিও রেকর্ডে আছে। এই সিরিজ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চে। সেটি এগিয়ে আনা হয় ২০২৬ সালের আগস্টে, কারণ মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ১৫০ বছর পূর্তির টেস্টটির জন্য জায়গা করতে হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের সফরের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে অন্য একটি সিরিজের সুবিধা অনুযায়ী।
এর পেছনের কাঠামোটি ক্রিকেট-অর্থনীতির। আইসিসির ২০২৪–২৭ চক্রে বিসিসিআই একাই পাচ্ছে সংস্থার বার্ষিক আয়ের প্রায় ৩৮.৫ শতাংশ, অঙ্কে যা বছরে প্রায় ২৩ কোটি ডলার। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ভাগ ৭ শতাংশের নিচে। বাকি আট পূর্ণ সদস্যের প্রত্যেকের ভাগ ৫ শতাংশেরও কম — বাংলাদেশ সেই তালিকাতেই।
যে বোর্ডের বাণিজ্যিক ওজন কম, তার বিপক্ষে সিরিজ আয়োজনের আর্থিক প্রণোদনাও কম। ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রামে তাই বড় দলগুলো নিজেদের মধ্যে খেলে বেশি, আর ছোট বাজারের দলগুলো অপেক্ষা করে। ২৩ বছরের ফাঁকটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফল।
এই প্রেক্ষাপটেই ডারউইনের দুই দিন তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় টেস্টে বাংলাদেশের একমাত্র জয়টি এসেছিল ২০১৭ সালে মিরপুরে, ২০ রানে। সুযোগ কম পাওয়া একটি দল যখন সুযোগ পায়, তখন কী হতে পারে — মারারা ওভাল সেটিই দেখাচ্ছে।
ম্যাচের এখনো তিন দিন বাকি। টেস্ট ক্রিকেট দ্রুত রং বদলায়, আর এই উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার ফিরে আসার সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। ফল যা-ই হোক, প্রশ্নটি থেকে যাবে: বাংলাদেশকে পরের টেস্টটি খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় আবার কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?
প্রেক্ষাপট — এর পেছনে যা ঘটেছিল
অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ টেস্ট মুখোমুখি: ৬ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ৫ জয়, বাংলাদেশ ১।
এই সিরিজ ২০২৫–২৭ আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ।
২০০৪ সালের পর অস্ট্রেলিয়ায় এটিই প্রথম শীতকালীন টেস্ট।
